জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
এবারো কোরবানির চামড়ায় দাম নেই, সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে । সারাদেশে কোরবানির চামড়ায় নিয়ে বিপাকে প্রিন্তিক ও মৌসুমি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে সারাদেশজুড়ে চলছে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ ও বিক্রির তোড়জোড়। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের দিন দুপুরের পর থেকেই চামড়ার বাজারে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে কম দামে চামড়া কিনছেন। অন্যদিকে ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের দাবি—লবণের বাড়তি দাম ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ বাড়ায় দামে কিছুটা তফাত হচ্ছে।
ত্যাগের মহিমায় পশু কোরবানি শেষ হতেই ব্যস্ততা বেড়েছে দেশের চামড়ার বাজারগুলোতে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সকাল থেকেই পাড়া-মহল্লা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে নিয়ে আসছেন আড়তগুলোতে। লক্ষ্য—যথাযথ মূল্যে তা বিক্রি করা।
তবে শুক্রবার (২৯ মে) দুপুরের পর থেকেই বাজারের চিত্রটা পাল্টাতে শুরু করে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আড়তদারেরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে মাঠ পর্যায় থেকে যারা চামড়া কিনেছেন, তারা কাঙ্ক্ষিত লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকা তোলা নিয়েই শঙ্কায় আছেন।
এক মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, আমরা সকাল থেকে কষ্ট করে চামড়া সংগ্রহ করে এনেছি। কিন্তু দুপুরের পর বাজারে এসে দেখি দাম অর্ধেকেরও কম। সরকার যে দাম ঠিক করে দিয়েছে, বাস্তবে সেই দামের কোনো মিল নেই।
আরেক ব্যবসায়ী বলেন, যে চামড়া ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা, সেটা ১৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। না বিক্রি করলে আবার পড়ে থাকবে, তাই বাধ্য হয়েই কম দামে ছাড়তে হচ্ছে।
অন্যদিকে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, লবণের বাড়তি দাম এবং দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় মাঠ পর্যায়ের সঙ্গে দামের কিছুটা তফাত তৈরি হয়েছে।
এক আড়তদার বলেন, পশুর চামড়া আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান একটি রপ্তানি পণ্য। মৌসুমি ব্যবসায়ী আর আড়তদারদের এই চোর-পুলিশ খেলার অবসান ঘটিয়ে সরকারি নজরদারি ও তদারকি আরও জোরদার করা গেলে দেশের এই মূল্যবান সম্পদ রক্ষা পাবে।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুর হাসান বলেন, ছোট চামড়া দেড়শ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি ৫০০ থেকে ৭০০। বড় সাইজের চামড়া ৯০০ বা হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে বেশিরভাগ চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
সরকার নির্ধারিত দামের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার যে নির্ধারিত দাম দিয়েছে এটা লবণযুক্ত চামড়ার দাম। গতবারের তুলনায় এবার লবণের বস্তায় দুই থেকে আড়াইশ টাকা বাড়তি। লবণ দেওয়া থেকে শুরু করে কেরিং, ওঠানামা—সব মিলিয়ে একটি চামড়ায় ৩০০-৪০০ টাকা খরচ পড়ে যায়।
মঞ্জুর হাসান আরও দাবি করেন, চায়না (চীন) সিন্ডিকেট করে রেখেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের চামড়ার বাজারে ইউরোপ না আসবে ততক্ষণ পরিস্থিতি ঠিক হবে না।
তার ভাষায়, আমরা একমাত্র চাইনিজ সিন্ডিকেটে আটকে আছি। চায়না বড় বড় ব্র্যান্ডের কাছে চামড়া বিক্রি করছে। আমাদের দেশে সু ফ্যাক্টরি বাড়ছে, কিন্তু চামড়া বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ট্যানারিতে সরকারের অর্থায়ন প্রত্যাশা করছি। ১০০ কোটি টাকা বকেয়া আছে। আমরা মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের টাকা দিতে পারছি না, যে কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সুযোগ পায়।
সব মিলিয়ে কোরবানির চামড়া বাজারে এবারও দাম, খরচ, সিন্ডিকেট ও আন্তর্জাতিক বাজারের জটিলতা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
#