জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে । তিনি বলেন, বাজারকে আরও গভীর, সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও ন্যায্য করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ভালো ও বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আজ শুক্রবার (৪ আগস্ট) ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) সদস্যদের জন্য আয়োজিত আবাসিক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিএমজেএফের সভাপতি মনির হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব রাসেল।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ’আমি কনফিডেন্ট যে আগামী এক বছরে এই স্টক মার্কেটটা আগের মতো আপনারা দেখবেন না। এই স্টক মার্কেটটা আরও অনেক ডিপার হবে, অনেক ভালো ভালো কোম্পানি আসবে। তখন আমাদের যে বর্তমান দুর্বলতাটা আছে, ইনশাআল্লাহ আমি আশা করছি তখন আরও কমে আসবে’।’
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য বাজারের উত্থান-পতন নিয়ে স্বল্পমেয়াদি চিন্তা করলে হবে না। বাজারে জোয়ার-ভাটা থাকবে, এটি স্বাভাবিক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার লক্ষ্য হচ্ছে একটি ‘অর্ডারলি, ফেয়ার ও ট্রান্সপারেন্ট’ মার্কেট গড়ে তোলা। বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার দুদিনের মধ্যেই ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল মরগান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান।
তিনি বলেন, ফ্লোর প্রাইসের কারণে মরগান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইনডেক্স বাংলাদেশকে স্থগিত করেছিল। এ সূচক একটি দেশের পুঁজিবাজার কতটা আকর্ষণীয়, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লোর প্রাইসের মতো ‘মেকশিফট প্র্যাকটিস’ বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও নিরুৎসাহিত করে। তিনি জানান, পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আগামী মাস থেকে বাংলাদেশের জন্য মরগান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইনডেক্স আবার চালু হতে পারে।
বেক্সিমকোর জিডিআর ইস্যুতেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে বোর্ড সভার অনুমোদন দিয়ে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে স্থগিত থাকা বেক্সিমকোর জিডিআর পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। এটি করা না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জিডিআর ইস্যুর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারত বলেও জানান তিনি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ডিএসই একটি প্রাথমিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। তাই তাদের পরিদর্শন কার্যক্রম, সার্কিট ব্রেকার নির্ধারণ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিদর্শনের ক্ষেত্রে আরও ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, তালিকাভুক্তির বিধিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব ডিএসইর। তারা দায়িত্ব পালন না করলে বিএসইসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
দেশের পুঁজিবাজার এখনো মূলত খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রায় ৯০ শতাংশ বিনিয়োগকারীই খুচরা বিনিয়োগকারী। বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ খুবই কম। তার মতে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ না বাড়াতে পারলে পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন হবে না।
এ জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগের কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ট্রাস্ট আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি গ্রিন বন্ড ও সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও সেটিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো জরুরি উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে বাজারে হাতে গোনা কিছু ভালো কোম্পানি রয়েছে। অনেক কোম্পানির আয়ের ওঠানামা বেশি হওয়ায় তাদের আর্থিক ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
মাসুদ খান বলেন, আইপিও প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। তাই সরাসরি তালিকাভুক্তি বিধিমালা ঢেলে সাজিয়ে নতুন ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আইপিও ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হবে। আইপিও প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে মনে করছে বিএসইসি।
তিনি বলেন, বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে স্বপ্রণোদিতভাবে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করা হবে। তবে প্রয়োজন হলে আইন প্রয়োগের সুযোগও রয়েছে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, সিকিউরিটিজ আইনের ২০-এ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে জনস্বার্থে কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া সম্ভব। এ জন্য ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি’র একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হবে।
স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে কর সুবিধার বিষয়টিও তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে করহারে সুবিধা রয়েছে এবং এ সুবিধা আরও বাড়ানোর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
দেশের করপোরেট বন্ড মার্কেটকে এগিয়ে নিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে করপোরেট বন্ডের তালিকাভুক্তি ফি ৮০ শতাংশ কমানোর কথা জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, আগে মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির ফি বেশি থাকায় কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহ ছিল। বর্তমানে ফি কমানো হয়েছে। ফলে আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে মূল বোর্ডে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক করপোরেট বন্ড লেনদেন হতে পারে।
করপোরেট বন্ডে আকর্ষণীয় কুপন রেট থাকার বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক বন্ডে ‘এ’ ক্যাটাগরির ব্যাংকের ছয় মাসের এফডিআর হারের সঙ্গে প্রায় ৩ শতাংশ স্প্রেড রয়েছে। ফলে এসব বন্ডে প্রায় ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কুপন রেট পাওয়া যাচ্ছে।
ক্লিয়ারিং ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) চালুর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিএসইসি। তিনি বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে সিসিবিএল চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এর জন্য শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থারও উন্নয়ন করতে হবে।
বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে ডেরিভেটিভ লেনদেন পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থায় যেতে হবে।
বর্তমানে বিভিন্ন ব্রোকার নিজস্ব সফটওয়্যার ব্যবহার করায় ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছে বিএসইসি। এ জন্য সব ব্রোকারের জন্য একটি অভিন্ন সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সিসিবিএলের সঙ্গে এ সফটওয়্যারের এপিআই সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে- উল্লেখ করেন মাসুদ খান
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, মার্জিন বিধিমালা এরই মধ্যে করা হয়েছে। ক্যাপিটাল ইস্যু-সংক্রান্ত বিধিমালার পর আইপিও বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হবে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন আইপিও বিধিমালা আনার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালাতেও পরিবর্তন আনা হবে।
তিনি বলেন, একটি বিধিমালা পরিবর্তন করতে সাধারণত দীর্ঘ সময় লাগে। তবে বিএসইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুত কাজ করছেন।
তিনি বলেন, দ্বৈত কর পরিহারসংক্রান্ত ছাড়পত্র না পাওয়ার কারণে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি লভ্যাংশের অর্থ বিদেশে পাঠাতে পারছিল না। এ সমস্যা সমাধানে এখন থেকে অনুমোদনের জন্য বারবার বিএসইসির কাছে আসতে হবে না।
লভ্যাংশের পুরো অর্থ পাওয়ার পর এক মাসের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান বিএসইসির চেয়ারম্যান।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য আর্থিক শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএসইসি। আগামী এক বছরে আর্থিক সাক্ষরতা কার্যক্রম কয়েক গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান বিএসইসির চেয়ারম্যান। তিনি জানান, মাস এডুকেশন, প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি এর কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের সমালোচনা ও গালিগালাজ শুনলেও তিনি কাজ থামাননি। কারণ স্বল্পমেয়াদি চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে।
#