নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বহুল আলোচিত ও নিন্দনীয় ঘটনা, রাজধানীর ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পুলিশ প্রশাসনে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন একটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক ও ৮৪ জন তরুণ-তরুণীকে আটকের বিষয়টি রাষ্ট্রকে নাড়া দিয়েছে। এই ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হবার ওই বাড়ির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের হেডকোয়ার্টার্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
আজ বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। তিনি আরো জানান পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত এক আদেশে অভিযুক্ত ওই অতিরিক্ত ডিআইজি জহিকে পদায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এরআগে গত সোমবার (২০ অক্টোবর) রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পিওএইচএস-১ হাউজিংয়ের পুলিশ ফাঁড়ি-সংলগ্ন আড়াইতলা ভবনটিতে অভিযান শুরু করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত চলা এই অভিযানে ৫৮ জন তরুণ ও ২৬ জন তরুণীসহ মোট ৮৪ জনকে আটক করা হয়।
মোবাইল কোর্ট বসিয়ে আটক ছেলেদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ১৫ দিন কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, মেয়েদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিনদিন কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম ও উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির গণমাধ্যমকে জানান, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ‘এয়ারবিএনবি’-এর মাধ্যমে এ বাড়িটির কক্ষগুলো ভাড়া দেওয়া হতো এবং সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন ও অবৈধ ডিজে পার্টির আসর বসত। অনলাইনে বুকিং নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণ-তরুণীরা এসব পার্টিতে অংশ নিতেন। এ থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৭০ শতাংশ অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির এবং ৩০ শতাংশ তার নিযুক্ত কো-হোস্ট ও কর্মীরা পেতেন।
ঘটনার বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির জানান, তিনি মূলত স্পেস বা জায়গা ভাড়া দিয়েছেন, অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য কাউকে ভাড়া দেননি। ভাড়ার চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনার খরচ ও কো-হোস্টদের ৩০ শতাংশ বাদ দিয়ে বাকি ৭০ শতাংশ অর্থ তিনি নিয়ে থাকেন। তবে তার দাবি, বাড়িওয়ালাদের পক্ষে ভাড়াটেকে ঘরে বসেই সবসময় পাহারা দেওয়া বা তাদের সব কর্মকাণ্ডের খবর রাখা সম্ভব নয়। ভাড়াটেকে নিয়মকানুন বলে দেওয়া হলেও কেউ সেখানে অবৈধ কিছু করলে তার দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকের ওপর বর্তায় না।
এ সময় বিকৃত সংবাদ পরিবেশনের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সত্যতা যাচাই না করে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া বাড়িতে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। ২০২৫ সাল থেকে এসব আয়োজন চলছিল। অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা এসব পার্টিতে যোগ দিতেন।
তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ভবনটিতে প্রবেশের পর ডিজে পার্টির আয়োজন দেখতে পান তারা। সেখানে প্রায় ২২টি গাড়ি ছিল। ভেতরে উচ্চ শব্দে গান বাজছিল এবং সীসা সেবনের কারণে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পরিবেশ ছিল। পার্টিতে উপস্থিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারও ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, সেখানে ২৬ জন তরুণী ছিলেন। তাদের অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীও সেখানে ছিলেন।
অভিযানে মদের তিনটি বোতল, ইয়াবা ও কুশ নামের একটি মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া যৌনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সামগ্রীও উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানের সময় পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করলে পার্টি বন্ধ হয়ে যায় এবং উপস্থিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন কক্ষে চলে যান। ভবনটিতে পাঁচটি কক্ষ ছিল।
আ. দৈ./একে