নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী ২০ জুলাই সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করবেন। এ বৈঠকরে পর নৈশভোজেরও আয়োজন রাখা হয়েছে।
সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ২০ জুলাই সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে নৈশভোজেরও আয়োজন রাখা হয়েছে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান ২০ জুলাই যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তবে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দল বা আলোচ্যসূচি সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অন্যদিকে, বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দলগুলোর বাইরে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের এ মতবিনিময়ে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য, সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে এটিই হবে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক।
রাজনৈতিক মহলে এ উদ্যোগকে কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে নয়, বরং জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের আগে বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৪২টি রাজনৈতিক দল সক্রিয় ছিল। নির্বাচনের সময় শরিকদের মধ্যে ১১টি দলকে ১৬টি আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। সরকার গঠনের পর শরিকদের মধ্য থেকে দুজন নেতা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেও অধিকাংশ দল এখনো সরকার কিংবা বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাশিত প্রতিনিধিত্ব পায়নি বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা মনে করেন।
জোট শরিক সূত্রে জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জোটের শরিক দলগুলোকে বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। এ নিয়ে শরিকদের সঙ্গে চলছে টানাপোড়েন। তাই মিত্রদের মান ভাঙাতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যমুনা বৈঠক ও নৈশভোজের আয়োজন করেছেন। সেখানে তারেক রহমানের সঙ্গে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের খোলামেলা আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জোট শরিকদের একটি অংশ মনে করছে, আসন্ন বৈঠক শুধু সৌজন্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সরকার ও জোটের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, রাজনৈতিক সমন্বয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিকদের অংশগ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে যে বৈঠকে আমন্ত্রণ পাব। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কবে জানানো হবে, সেটি এখনো বলা হয়নি। ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। ভবিষ্যতেও সেই রাজনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করি।’ বলছিলেন শেখ রফিকুল ইসলাম।
জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে শুনেছি। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাইনি।’ ‘বৈঠক হলে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরব। পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হবে।’ -সাইফুল হক, সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দুই-তিন দিন ধরে বৈঠকের কথা শুনছি। এখনো আমন্ত্রণ পাইনি। বৈঠক হলে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরব। পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হবে।’
বাংলাদেশ লেবার পার্টি দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন করেছে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি দলটি বিএনপির জোট ছেড়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ দুই দশকের সম্পর্ক। মামলা, হামলা ও জেল-জুলুমের ভাগীদার ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে এখনো কোনো আমন্ত্রণ পাইনি। তবে দেশ ও জাতির স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের আমন্ত্রণ জানান, আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।’
এদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির সাবেক এক জোটশরিক, যিনি বর্তমানে বিএনপিতে রয়েছেন, তিনি বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাকে আগামী ২০ জুলাই সন্ধ্যায় অন্য কোনো কর্মসূচি না রাখতে বলা হয়েছে। তার দাবি, তাকে প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।
বিএনপি জোটের শরিক নেতাদের একটি অংশের মতে, যুগপৎ আন্দোলনে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে রাজপথে থাকার পর সরকার গঠনের পর তাদের অনেকের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাদের আশা, এ বৈঠকে সরকার পরিচালনায় শরিকদের ভূমিকা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হবে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জোটভিত্তিক রাজনীতিতে সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময় রাজনৈতিক আস্থার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই বিবেচনায় ২০ জুলাইয়ের সম্ভাব্য বৈঠকটি শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তবে বৈঠকের ফলাফল এবং শরিকদের প্রত্যাশার কতটা প্রতিফলন ঘটে, সেটিই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
#