বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৩৯ অপরাহ্ন

ডিএনসিসির প্রশাসক এজাজের সিন্ডিকেট শক্তভাবে মাঠে নেমেছে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য গৃহিত প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার কাজের  মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের আর্শিবাদপুষ্ট স্নেহের ভাগ্নে, ভাতিজা, আত্মীয় স্বজন, প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং কতিপয় আঞ্চলিক নির্বাহী প্রকৌশলী সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী সিন্ডিকেটের লাগামহীন লোপাটের সুনিদিষ্ট অভিযোগ শক্তভাবে ধরার জন্য মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
 ইতোমধ্যে দুদকের পক্ষ থেকে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমান অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনিদিষ্ট অভিযোগ শক্তভাবে অনুসন্ধের স্বার্থে নোটিশ পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবদ শুরু করেছে।  তবে গত ২৯ জানুয়ারি সকাল ১০ টায় প্রশাসক এজাজকে দুদকে ডাকা হলেও তিনি হাজির হননি। এরপর ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিন এবং ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও সচিব মুহম্মদ আসাদুজ্জামানকে দুদকের জিজ্ঞাসাবদ করা হয়েছে।এইপর আরো অনেককেই জ্ঞিাসাবাদের তালিকায় রাখা হয়েছে বলে জানা যায়।
এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন প্রশাসক এজাজের সিন্ডিকেট। প্রশাসকের কথিত আত্মীয় বহিরাগত দালাল মাহবুবুর রহমান, লিটন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান, অঞ্চল- ৫ এর (ভারপ্রাপ্ত) নির্বাহী প্রকোৗশলী মো. মিজানুর রহমান, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানসহ আরো একাধিক প্রকৌশলী, সংশ্লিষ্টকর্মকর্তা এবং একাধিক বিভাগীয় প্রধানের সমন্বয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেট লাগামহীন লোপাটের নজির স্থাপন করেছেন।
ইতোমধ্যে তারা ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বাজেটের সিংহভাগ অর্থ উন্নয়নমূলক কাজের নামে প্রকল্প খরচ করা হয়েছে।  বাজের্টের বাকী অর্থও প্রশাসকের মেয়াদের মধ্যে  কেনা কাটা ও প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজের নামে লোপাটের মিশন সম্পন্ন করার জন্য বেশ  তৎপরতা চলছে। কিন্তু দুদকের তলবি নোটিশের পরও প্রশাসকের নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট আরো কয়েক শত কোটি টাকার নথিতে সই স্বাক্ষর করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। তবে লোপাটকারী সিন্ডিকেটের  দুই/ চার জন গোপনে পালানোর পথ খুঁজছেন বলে জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, উন্নয়ন ও সংস্কা প্রকল্পের টেন্ডার আহবানের আগে অবশ্যই কারিগরি বিনির্দেশ কমিটি সুপারিশসহ মতামত গ্রহনে আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।  কিন্তু ডিএনসিসিতে প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের প্রকৌশল বিভাগে সিন্ডিকেট ওইসব আইন কানুন ও বিধির তোয়াক্কা না করেই ইচ্ছামাফিক প্রকল্প গ্রহণ,অর্থ বরাদ্দ,কাজের টেন্ডার আহবান করা, পছন্দের ঠিকাদারকে মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে কাজ বন্টন এবং কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রন্ডক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সূত্র মতে,প্রধান প্রকৌশল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মইন উদ্দিনের সভাপতিত্বে গত ৪ ডিসেম্বর নগর ভবনে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী কর্মকর্তাদের নিয়ে  সভা করেন। ওই সভায় বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কার মূলক প্রকল্পের সার্বিক পরিস্থিতি, অর্থ বরাদ্দ, অর্থ ব্যয়, অর্থের স্বল্পতা, অনুমোদিত ও প্রস্তাবিত কাজের (প্রকল্পের) বাজের্টের অর্থ ব্যয়ের জন্য পুনরায় নির্ধারন করে দেন। কিন্ত তার এই নির্দেশনা অধিনস্থ  বেশ কয়জন আঞ্চলিক নির্বার্হী প্রকৌশলী পাত্তা দেয়নি।
 সর্বশেষ খবরে জানা যায় প্রধান প্রকৌশলীর সভার সিদ্ধান্ত , নির্দেশনার অমান্য এবং ডিএনসিসির কারিগরি বিনির্দেশ কমিটি সুপারিশ ও মতামত ছাড়াই প্রশাসকের সিন্ডিকেটের ক্ষমতাবলে অঞ্চল- ৫ এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকোৗশলী মো. মিজানুর রহমান ৫৯টি কাজের টেন্ডার করেছেন। এরমধ্যে তিনি গত ১০ ডিসেম্বর ৭ ধাপে ৩৬ টি, গত ১১ ডিসেম্বর ৩ ধাপে ১৮টি, গত ১৭ ডিসেম্বর ৪ টি এবং গত ২২ ডিসেম্বর ১টি কাজের টেন্ডার আহবান করেন।  অর্থাৎ তিনি ১৩টি স্বারক নম্বর ব্যবহার করে ৫৯টি কাজের নামে ১৪৬ কোটি টাকার টেন্ডার আহবান করেছেন মিজানুর রহমান। ঠিকাদারদের কাছে থেকে মোটা অংকের অগ্রীম কমিশন হাতিয়ে নিয়ে এখন কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর প্রশাসকের ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরো অভিযোগ রয়েছে,২০২৪ সালে ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের পতন এবং সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের বিদায়ের পর ওই বছর ৯ ডিসেম্বর  উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান ডিএনসিসিতে যোগদান করেন। সর্বশেষ প্রকৌশলীদের তালিকায় তার নাম-১১ নম্বরে রয়েছে। এরপর তাকে  উপসহকারীর নিজ দায়িত্বসহ অতিরিক্ত সহকারী প্রকৌশলীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তবে প্রশাসকের সিন্ডিকেটর সুবাধে অবার মো. মিজানুর রহমানকে অঞ্চল-৫ এ নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দায়িত্ব পাবার পর তিনি ফ্রি স্টাইলে লোপাটের রেকর্ড করে যাচ্ছেন হয়েছে। তার দুর্নীতি লাগাম টানার যেন কেউ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
অপরদিকে গত ৪ ডিসেম্বর প্রধান প্রকৌশলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা পাবার আগেই অঞ্চল ২ এর (ভারপ্রাপ্ত ) নির্বাহী মো. কামরুল হাসান গত ৩০ নভেম্বর ৩ ধাপে ৩৩টি কাজের জন্য ১৪৫ কোটি টাকার টেন্ডার আহবান করেন। এই বিষয়ে ‘আজকের দৈনিক পত্রিকাকে’ নির্বাহী মো. কামরুল হাসান বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন,মতামত নিয়ে আইনও বিধিমালা অনুসরণ করেই কাজের টেন্ডার করা হয়েছে।
একই কায়দায় অঞ্চল- ৩ নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নুরুল আলম গত ১ ডিসেম্বর ১৮টি এবং গত  ৩ ডিসেম্বর ১ সহ মোট ১৯ কাজের  জন্য ১২২ কোটি টাকার টেন্ডার আহবান করেন। তিনি বার্ষিক বাজেটের পুরো কাজের টেন্ডার আহবান করেন এবং ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য প্রশাসকের দপ্তরের সিন্ডিকেটের পুরো ক্ষমতা প্রয়োগ করনে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
 অথচ প্রধান প্রকৌশলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনায় পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে ডিএনসিসির বাজেটে অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে, এমতাবস্থা তাদেরকে সীমিত কাজের বাজেট নির্ভারণ করে ওেয়া হয়। এরবাইরে কাজের টেন্ডার করা যাবে না এবং টেন্ডার আহবান করা হলে, তা বাতিল কিংবা স্থগিত করতে হবে। গত ৪ ডিসেম্বর প্রধান প্রকৌশলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অঞ্চল -৫ কে ৮০ কোটি টাকা, অঞ্চল-২ কে ৭৫ কোটি টাকা এবং অঞ্চল-৩কে ৭০ কোটি টাকার  কাজ করা বিষয়ে কড়া সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এসব বিষয়ে প্রকৌশলী মিজানুর রহমান ‘আজকের দৈনিক’ পত্রিকাকে বলেন,আনিত অভিযোগগুলো সত্য নয়। তিনি আনিত অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, অফিসের আইন, বিধি, নিয়ম ও সিদ্ধান্ত মেনেই ৫৯টি কাজের টেন্ডার করেছেন। এখনো তাকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার লোপাট,দুর্নীতি এবং বিপুল পরিমান অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সত্য নয় বলে তিনি দাবি করেন।
মিজানুর রহমান তার চাকরিতে যোগদান প্রসঙ্গে বলেন;  প্রথমে ২০০৫ সালে ৭ মার্চ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হিসেবে উপসহকারি প্রকৌশলী পদে চাকরিতে যোগদান করেন। এরপর অনুমতি নিয়ে বিএসসিসি ইনিঞ্জিয়ারিং পাস করে ২০০৯ সালে সহকারী প্রকৌশীলী পদে পদোন্নতিসহ যোগদানের আবেদন জানান। কিন্তু তাকে কোন সুযোগ না দিয়ে  কর্তৃপক্ষ সাময়িক বরখাস্ত করেন। এরপর তিনি হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করেন। ২০১৪ সালে আদালত তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেন এবং পদোন্নতি দিতে বলা হয়। এই আদেশের বিরুদ্ধে ডিএনসিসি আপিল করে। এভাবে চলতে থাকে।
 এরপর ২০২০ সালে ২০ ডিসেম্বর তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানকে বরখাস্ত করেন। এরপর মিজানুর রহমান আবার আপিল বিভাগে আবেদন করেন। এভাবেই কেটে যায় ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
#


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


অনুসন্ধান

নামাজের সময়সূচী

[prayer_time pt="on" sc="on"]

অনলাইন জরিপ

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপি এখন লিপসার্ভিসের দলে পরিণত হয়েছে।’ আপনিও কি তাই মনে করেন? Live

  • হ্যাঁ
    25% 3 / 12
  • না
    75% 9 / 12